Friday, January 27, 2023
Homeদেশ'সেটিং’ জল্পনা উড়িয়ে নীতি আয়োগের বৈঠকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার মমতা...

‘সেটিং’ জল্পনা উড়িয়ে নীতি আয়োগের বৈঠকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার মমতা…

‘মৌন মমতা’ চার দিনের দিল্লি সফরে এসে বিরোধী ও নিন্দুক মহলে এমনই তকমা কুড়িয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার কারণও ছিল যুক্তিগ্রাহ্য। সাম্প্রতিক কালে রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং দলের প্রভাবশালী নেতার গ্রেপ্তারিকে কেন্দ্র করে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে রাজ্য সরকার, সেই আবহে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি বা বিরোধী দলীয় নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের মতন বিষয় থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন তিনি। আপাতদৃষ্টিতে এবারের তাঁর দিল্লি সফর ছিল আপাদমস্তক ‘লো প্রফাইল’-র। বক্তব্যের নিরিখেও ‘আণ্ডার টোন’ ছিলেন রাজ্য মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু রবিবার ছিল তাঁর ব্যতিক্রম। তাঁর রাজধানী সফর নিয়ে উত্থাপিত ‘মিটিং সেটিং’ এর তত্ত্বকে নস্যাৎ করে আবারও দাপুটে মেজাজে ফিরলেন মমতা।

দলীয় সূত্রের দাবি, দিল্লি সফরের শেষদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) ফের দেখা গেল স্বমহিমায়। সপ্তম নীতি আয়োগের বৈঠকে রাজ্যের দাবিদাওয়া তথা নব্য কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি বলবৎ করার প্রস্তাব সহ একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নীতির তীব্র সমালোচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। জানালেন, ‘টিম ইন্ডিয়া’ বললেই ‘টিম ইন্ডিয়া’ গঠন করা যায় না। তার জন্য অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় আস্থাশীল হতে হবে তথা রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে সিদ্ধান্ত। একপেশে কোনও পদক্ষেপ ‘টিম ইন্ডিয়া’ গঠনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে। তা-ই রাজ্যের সঙ্গে এ সব ক্ষেত্রে অগ্রিম পরামর্শ করেই নিতে হবে বিশেষ গঠনমূলক সিদ্ধান্ত। ভারতীয় সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সারকথাও সেটাই।

শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি ভবনে স্বাধীনতার অমৃত মহোত্‍সব কমিটির বৈঠকে বক্তব্য পেশ করার জন্য ডাক পাননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি রবিবার রাষ্ট্রপতি ভবনের কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত সপ্তম নীতি আয়োগের বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই জানিয়ে দেন, দুপুরের বিমানে তাঁকে কলকাতায় ফিরতে হবে। তার আগে যদি নিজ বক্তব্য পেশ করার সুযোগ না পান, তবে তিনি লিখিত বক্তব্য জমা দিয়েই বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর এহেন কড়া মনোভাবে নতিস্বীকার করে কেন্দ্র। রবিবার নীতি আয়োগের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরেই বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ নয়াদিল্লিতে সরকারি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, রবিবার নীতি আয়োগের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য রেখেছেন প্রায় সাড়ে ন মিনিট৷ অন্যান্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বক্তব্যের জন্য সাড়ে সাত মিনিট বরাদ্দ থাকলেও এদিন মুখ্যমন্ত্রী নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে সামান্য বেশি সময় পান এবং তার সদ্ব্যবহার করতে পিছপা হননি তিনি।

নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন, মুখে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো বজায় রাখার কথা বলা হলেও কাজের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের উপরে, যা অনৈতিক ও অনভিপ্রেত৷ যে কোনও রকম কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা রূপায়ণের ক্ষেত্রে রাজ্যের সঙ্গে কোনওপ্রকার আলোচনা না করে, কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ টিম ওয়ার্কে নির্ভর না করেই কাজ করছে কেন্দ্রীয় সরকার, রবিবার নীতি আয়োগের বৈঠকে এমনই অভিযোগ করেন মমতা৷ তিনি এও বলেন, ‘বাংলা বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী, তাই সবসময়ে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে চলে এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশ মেনে কাজ করার চেষ্টা করে৷ এই ক্ষেত্রে রাজ্যের প্রত্যাশা, আদর্শ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলা তার প্রাপ্য মর্যাদা পাবে৷’

কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কের উন্নয়নে রাজ্যের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা প্রদানের পক্ষে এদিন জোরালো সওয়াল করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এর পরেই কেন্দ্রের নব্য জাতীয় শিক্ষা নীতিকে কেন্দ্র করে মোদী সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনটাই দাবি করা হয়েছে সরকারি সূত্রে৷ রাজ্যের সঙ্গে সবিস্তারে আলোচনা না করেই যেভাবে জাতীয় শিক্ষা নীতি চাপানোর চেষ্টা হয়েছে রাজ্যগুলির উপরে, সেই কেন্দ্রীয় প্রয়াসের বিরোধিতা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ সূত্রের দাবি, এই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, দেশের ভবিষ্যত গড়ার স্বার্থেই শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় ভীষণ জরুরি এবং এই ক্ষেত্রে রাজ্যের উপরে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রদর্শিত পথে হেঁটেই এদিন বিরোধী শাসিত রাজ্যের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার পক্ষে জোর সওয়াল করেন ছত্তিসগড়, রাজস্থান এবং পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীরাও৷

প্রসঙ্গত, শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ১ লক্ষ ৯৬৮ কোটি টাকা বকেয়া প্রসঙ্গে সোচ্চার হন এবং প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে কোন খাতে রাজ্যের কত বরাদ্দ, তার পূঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব তুলে ধরেন৷ কেন্দ্রীয় সরকার যে করের টাকা সংগ্রহ করে রাজ্যগুলির মাধ্যমে, সেখানে রাজ্যের ভাগের অংশ বাড়ানো হোক, দীর্ঘদিন আগেই এই মর্মে সোচ্চার হয়েছিল বিরোধী শিবির৷ এদিন আরও একবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছেন৷ তাঁরই সুরে সুর মিলিয়ে এদিনের বৈঠকে ছত্তিসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল এবং রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট একই ইস্যুতে সোচ্চার হন।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্যনীয়, চলতি বছরের শেষেই ভারতে আয়োজিত হবে জি-২০ শিখর সম্মেলন৷ এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগেই টুইট করে জানিয়েছেন স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে জি-২০-র আয়োজন ভারতের কাছে বড় কৃতিত্বের৷ এদিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, দেশের সুনাম অর্জনকারী জি-২০ শিখর সম্মেলনের আয়োজনে নিজেদের সেরাটা তুলে ধরবে পশ্চিমবঙ্গ, একইসঙ্গে কেন্দ্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমস্ত সহযোগীতায় অগ্রণী ভূমিকা নেবে রাজ্য। এর পর, নীতি আয়োগের এদিনের বৈঠকের মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির সময়েই বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী৷ তার আগে বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীদের গ্রুপ ফটোসেশন ছিল৷ সরকারি সূত্রের দাবি, ফটোসেশনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজে আহ্বান করে সামনের সারিতে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি স্বয়ং৷ মমতাও সেই অনুরোধ সানন্দে রক্ষা করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Skip to toolbar